Monday, 27 April 2015

ক্যামিসোল্ (৬১)

ক্যামিসোল্
অঙ্কুর কুণ্ডু

                                 রোজনামচার বদলে বাসি চোখ জুড়ে -
                                 ক্যামিসোলে ঢাকা ঋতুপর্ণা আয়নায় দাঁড়ালে ,
                                 ঝনঝনে কাঁচ ফোটার মত সূর্যের
                                 চিনচিনে আদর বয়স্ক প্রভাতী সঙ্গীত থামিয়ে
                                 চিন মিউজিক ভরে দেয় আমার লোমকূপে ৷
                                 এরপর ঋতুপর্ণা ঠোঁটৈ লিপগ্লস্ দিলে ,
                                 আমার চোখের ওপর পাতা পর্ণমোচনের মত
                                 ছন্দের সাথে নীচের তলা আঁকড়ে ধরে ৷

                                 ওর ক্যামিসোল্ হাত বেয়ে থ্রি-কোয়ার্টার হলে ,
                                 পাড়ুইয়ে বুলেট নাচার মতই আমার শরীর
                                 কেঁপে ওঠে ৷ জেগে ওঠে এলিপসিস্ আমার
                                 কবিতার লাইনগুলোয় ৷ ঘনঘন হেঁটে যাওয়া
                                 গ্রাম্য আলের থেকেও মসৃণ সেই ক্যামিসোলে
                                 ঢাকা হাত ৷ শরতের একফালি মেঘও আমার
                                 ঘোর কাটাতে পারেনি ৷ আমার গাল ছুঁয়ে
                                 ঋতুপর্ণা এর নাম দিয়েছিল ঋতুর অসুখ ৷

                                 বহুবার দেখেছি ঝুলে থাকা শরীরের গলায়
                                 বিচিত্র ডিজাইন জন্মের বিপরীত পথে
                                 হাঁটিয়েছে অনেককে ৷ ঋতুপর্ণার ক্যামিসোল্ জুড়ে
                                 এমব্রয়ডারী দেখে ও’খানেই প্রাণপাত করি ,
                                 কারণ ও’পারেই পরের জন্ম ৷ কোষে কোষে জাগে
                                 শিহরণ ওকে ছোঁয়ার জন্য ৷ ঋতুপর্ণা একফসলি –
                                 বারবার ঋতুপর্ণা জন্মায় না , তাই আমি
                                 ঋতুপর্ণাকে খুঁজতে বারবার জন্মাতে চাই ৷
                                
                                 ঋতুপর্ণা ও আমার এক ক্যামিসোল্ দূরত্ব আবহমান…

___________________________________________________________________________________

Saturday, 25 April 2015

সাবলিমিটি –শেষ পথ (৬০)

সাবলিমিটি –শেষ পথ
অঙ্কুর কুণ্ডু

                                   সিঁড়ি বেয়ে ছায়া উঠে এলে -
                                            ঋতুপর্ণা দরজা খুলে দিত ,
                                   একরঙা ছায়া উঠোন ডিঙোলে -
                                            সিঁড়ির ওপর থাপ্পর পড়ত ৷
                                  
                                   শালের লোমে কানের দুল আটকে
                                   ঋতুপর্ণা চিল-চিৎকার জুড়লে, ওর ঠোঁট
                                   উড়ন্ত চিলের মতই টানটান হত৷ চিলের
                                   নখের মতই তীক্ষ্ণতায় ঋতুপর্ণা দেহে
                                   আঁক কাটলে ট্রামলাইনের খোপে জমে
                                   যাওয়া ধূলোরা বিদ্রোহ করে ওঠে, ওদের
                                   উড়ে যাওয়ার পথে ঋতুপর্ণার স্নিকার্স চুমু দিলে ,
                                   ওরা নিস্তেজ হয়ে একে অপরের পেটে ঢুকে যায় ৷

                                   বিগ্ বেনের শহরে তোমার নামে ব্যাঙ্ক্ খুলে
                                   গোছা-গোছা ড্রইং-বুক ঢোকানোর কথা ছিল !
                                   তোমার ঝরে পড়া চুলের মুঠোতে রং ভরে
                                   খেলনার ছলে ঝুলন্ত দাড়ি বানিয়েছিলাম ,
                                   সেই দাড়ির শেষভাগ বুকের কাছে থমকেছিল ৷
                                   ঐ বুকে তোমার চেয়ে থাকা, শুয়ে থাকা -সবই
                                   ছিল ভরা ঐ ড্রইংবুকে ৷ বাকী ছিল তোমার পিঠ
                                   ছুঁয়ে ক্যানভাসগুলো সিমা গ্যালারিতে তুলে দেওয়া…

                                   ঋতুপর্ণার খোলা দরজা দিয়ে -
                                            যারা ভেতরে আসছে ,
                                   তারা সকলেই ওর সন্তান , ঋতুপর্ণা মা ;
                                            এর বেশি আর এগোনো যায় না ৷
                                           

                                   

সঙ্কোচে আমার চোখেরা (৫৯)

সঙ্কোচে আমার চোখেরা
অঙ্কুর কুণ্ডু

       সর্বাণী আজ যেভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আছে , বিয়ের আগেও সেভাবেই তাকিয়ে থাকত ; চোখগুলো বেশ টানা-টানা , ঠিক দেবী দূর্গার মত. . . নয় , বরং সুন্দরী মহিলার মতই ৷ অফিস থেকে এসে দেখতাম , সর্বাণী শান্ত হাতে বাড়ির সকল কাজ করছে ৷ তারপর রাতের খাবার সেরে একই বিছানায় দু’জনে ঘুমাতাম ; আমাদের মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ছিল না ৷ স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কের সংজ্ঞা কী. . . বিয়ের পরে ক’টা রাত লাগে , তা বুঝতে ! অথবা , কতগুলো বিকেলে পরস্পরের হাত ধরে হাঁটলে নিজেদের স্বামী-স্ত্রী মনে হয় !


       বিয়ের প্রায় পর থেকেই বড় টেবিলটা সর্বাণীর সবচেয়ে প্রিয় জায়গা ৷ লাজুক সর্বাণী বরাবরই সেজে থাকতে ভালবাসে ৷ সর্বাণীর অতীতে সাজের সরঞ্জাম ও বর্তমানে সাজের সরঞ্জামের মধ্যে পার্থক্য আছে ৷ লাল শাড়ির মধ্যে কালো ফুল ও কালো পাড় এখনও আমার চোখে জল আনে ৷ বিয়ের আগে , ওকে ভালোবাসার আগে থেকেই জানতাম ক্যানসারগ্রস্ত সর্বাণী আর কয়েকদিন. . . তাও ওর ভালোবাসায় বিয়ে এবং বিয়ের দ্বিতীয় রাতেই ওর একার শয্যা ৷ ধূপের ধোঁয়ায় , ছবিতে সর্বাণীর চোখ এখনও টানা-টানা , আমার চোখেরাই শুধু বুজে আসছে !

সীতা , তুমিই সতী ! (৫৮)

সীতা , তুমিই সতী !
অঙ্কুর কুণ্ডু

সীতা , তুমি দেবীর বসন ছেড়ে নারী হও ; অথবা হতে পার নরমাংসের সতী ৷ সীতা , কেন আজও তোমায় দেখিনি –সকালে দু’হাত বাড়িয়ে হাই তুলছো কিংবা স্বামীকে ঠেলে ডাকছো ! দেখিনি তোমায় বই পড়তে , শুনতে পাইনি তোমার চা টানার আাওয়াজ ৷ বোধহয় তুমি লজ্জা পাও অথবা চাওনি যাতে পুরাণের পোশাক কখনও যায় ভোলা ! সীতা , তোমার পরিচয় কি ? তুমি তো নও আমাদেরই মহিলা !

                                 কেন হেঁটে যেতে ধীরে ধীরে
                                                নীচু মুখ
                                                দশরথ ডাকলে
                                 সুলগ্না বড়ই বেয়াদপ
                                                শ্বাশুড়ির ধমকে রা কাটে
                                                প্রথম চড়েই সুইসাইডের হুমকি
                                 থেমে যেত অত্যাচার –যা ছিল বাকী !

সীতা , তুমি কখনও কি বেরিয়েছিলে পঞ্চবটীর প্রাতঃভ্রমণে ! কেন পাখিরা তোমার কাছে চায়নি আশ্রয় ! তবে কি তখনও মায়ের কোমলতাকে ঢেকে রেখেছিল স্বামীর আকর্ষণ ! ডানায়-ডানায় কি খবর গিয়েছিল গাছের পাতায় , তাই বুঝি মর্মরধ্বনি তুলে ডালপালা শুকনো হয়েছিল , নিজেদের আহূতি দিয়েছিল তোমার চোখের আড়ালে যেতে চেয়ে ৷ সীতা , তোমায় দেখিনি পথের ধারে বাচ্চার সাথে , তবে সীতা , তোমার পরিচয় কি ? তুমি তো নও আমাদেরই মহিলা !

                                 রাজ্যের সন্তান ছেড়ে কিভাবে
                                                বনবাসে ছিলে
                                                সন্তান কি প্রতিশ্রুতির ভ্রূণ
                                 সুলগ্নাকে দেখেছি রাতে
                                                স্কুটি চালিয়ে ছুটত
                                                বাড়ির বারণ পেরিয়ে
                                 মুঠো মুঠো আদর দিত হেঁদুয়ার ফুটে !



সীতা , তুমি এত লোভী ! তুমি সীতা কম দামী মারীচের চেয়ে ! কেন ছুটিয়েছিলে রামকে আঁধারে ! কোথাও তোমার মনে দানা বেঁধেছিল স্বামীর বীরত্ব , তাই বুঝি লক্ষ্মণকে পীড়া দিয়েছিলে রামকে খোঁজার জন্য ! তুমি সীতা পূর্ণ নারী , আজও কি পূজিত এই সমাজে ? যে নারী গন্ডির মধ্যে থাকে , সে নারী সীতা , সতী নয় , দেবী , চলমান নয়  ! তবে সীতা , তোমার পরিচয় কি ? তুমি তো নও আমাদেরই মহিলা !

                                 তবু সীতা , তোমার জন্যই লঙ্কাকান্ড
                                                তোমার জন্যই রামায়ণ
                                                পড়েছে তোমার অনুরাগী
                                 সুলগ্না পুরুষের মুঠো থেকে
                                                দূরে রেখেছে নিজেকে
                                                নিজের উন্মুক্ত পথে
                                 আজও কোনো কাব্যই লিখতে পারেনি সে !



Sunday, 4 January 2015

ঋতুপর্ণা জন্ম নেবে না (৫৭)


…….
তুমি সেই ঋতুপর্ণা নও
    বর্ষায় যার পেখম মেলেছি
তুমি সেই ঋতুপর্ণা নও
    যাকে কবিতার খাতায় লিখেছি
ঋতুপর্ণা , তুমি নিছকই নারী
    মাথায় সিঁদুর পরে যে মানসী
সন্তানের কপালে ভাগ্যরেখা মুছে
    চুমুর আদরে অঝোরে ফুরিয়েছো

( আংশিক ৷ আনএডিটেড্ ৷ পরবর্তীকালে বদলাতে পারে ৷ ) ৷

Wednesday, 5 November 2014

অনুভবের নাম ছিল না (৫৬)


অনুভবের নাম ছিল না
অঙ্কুর কুণ্ডু

        ফুটপাথে থাকাকালীন অনুভবের কোনো নাম ছিল না ৷ এই বাড়ীতে এসে অনুভব খুঁজে পেয়েছে বাবা-মাকে ৷ নিঃসন্তান দম্পতিরা প্রায়শই অনাথ-আশ্রম থেকে বাচ্চা নেন ৷ মি.-মিসেস দত্ত দম্পতির অনুভূতির কথা ঠাহর করাই যায়নি ৷ রাস্তা থেকে আটবছরের ছেলেটাকে পরম যত্নে তুলে এনে নিজেদের সচ্ছ্বল পরিবারে জুড়ে দিলেন ৷ এই দম্পতিকে আর কেউই ‘আঁটকুড়ে’ বলে না ; অনুভবও আর অনাথ নয় ৷ কী দারুণ ভাগ্য !

        অনুভবের বাইরে যাওয়া বারণ , যদি ঘরের কেলেঙ্কারি. . . অনুভব যখন বাইরে ঘুরতে যায় তখন মা-বাবার মাঝে পরম আদরে ওনাদের হাত ধরেই থাকে ৷ রাস্তার ছেলে বলেই কী না জানা নেই , ওর গায়ে ঘা-ভর্তি ৷ আসলে ঘরের কাজ ঠিকমত না করলে তো মনিবরা কাজের লোকের ওপর রেগে থাকবেনই ৷ অনুভবের নতুন মা অনুভবকে একটু বসতে দেখলেই সারা গায়ে খুন্তির ছ্যাঁকা দিতে থাকেন ৷ রাস্তা থেকে ছেলে তুলে আনার এটাই একটা বড় সুবিধা ৷ অনুভবের যখন নাম ছিল না , তখন ও রাস্তার ছেলে ; এখন ওর নাম হয়েছে  , ও বড় হচ্ছে , তাই লোক. . . কাজের লোক !


মৃত্যু ঠোঁটে হাসিও আঁকে (৫৫)


মৃত্যু ঠোঁটে হাসিও আঁকে
অঙ্কুর কুণ্ডু

        গতকাল সকাবেলায় রাজু ‘মা , আসছি’ বলে সেই যে বেরোল , আর ফিরল না ৷ মারা গেছে রাজু ৷ যদিওবা ওর মা এখনও জানে যে ছেলে নিরুদ্দেশ ৷ আগামীকাল রাজুর বয়স হত বারো ৷ জন্মদিনের আগেই মৃত্যুর ঘটনা হামেশাই ঘটছে ৷ কিন্তু এইবারের জন্মদিনটা রাজুর কাছে আলাদাই হত ৷ কারণ তিনবছর বন্ধ থাকার পরে দুইমাস আগেই রাজুর মায়ের কর্মস্থল –পুতুল তৈরীর কারখানাটা খুলেছে ৷ ইচ্ছে ছিল এই জন্মদিনে ছেলেকে একটা জামা দেবে , সেইজন্য কিছু টাকা সরিয়েও রেখেছিল রাজুর মা ৷ কিন্তু তা আর হল কই… ইতিমধ্যেই সাদা চাদরে মুড়ে শোওয়া রাজু ঘরের সামনে চলে এল ৷

        রাজুর মা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে ছেলের সামনে বসে পড়ল ৷ রাজু ট্রেনে কাটা পড়েছে ৷ হঠাৎই রাজুর মা হেসে উঠল , মাথা কাজ করছে না যে তা নয় ; আসলে যখনই রাজুকে ওর মা পড়তে বলত ও এইভাবেই চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকত ৷ রাজুর মা জানেও না যে তার জমানো জন্মদিনের টাকায় অজান্তেই রাজুর বাবা ফুল-কাঠ-চাদরের আয়োজন করেছে , এবার যে…